২১শে ফেব্রুয়ারি অমর গানের জন্মকথা

জুয়েল রাজ

জুয়েল রাজ

ব্লগার এবং সাংবাদিক। বর্তমানে লন্ডন থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক ব্রিকলেন পত্রিকার বার্তা সম্পাদক। রাজনীতিতে ও যুক্ত আছেন কলেজ জীবন থেকে।

(আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারি অমর সেই গানটি কিভাবে জন্ম নিয়েছিল, কিভাবে প্রেরণা যুগিয়েছিল বাঙালিদের, গানটির স্রষ্টা আব্দুল গাফফার চৌধুরী জানিয়েছেন গানটির জন্মকথা।)

জুয়েল রাজঃ যারা বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে মাতৃভাষাকে রক্ষা করেছিলেন। যাদের জন্য আজকে পুরো পৃথিবীতে ২১শে ফেব্রুয়ারি “আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস” হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৯৫২ সালের এই দিনে যারা আমাদের মায়ের মুখের ভাষাকে কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করতে চেয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে ছাত্র জনতা নেমে পড়েছিল রাজপথে। মিছিলের ধ্বনিতে কেঁপে উঠেছিল পুরো রাজপথ। শুধু একটাই ধ্বনি- `রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।তখনই মিছিলের বুকে গর্জে উঠে পাকিস্তানী পুলিশের রাইফেল। শক্র-পক্ষের বুলেটের আঘাতে রাজপথেই লুটিয়ে পড়েন রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতসহ আরও অনেকে।দিনটি ছিল ২১ ফেব্রুয়ারী ১৯৫২ সাল ৮ই ফাল্গুন, ১৩৫৯ বাংলা ৷

ঢাকা মেডিকেল কলেজ চত্বরে ভাষা শহীদদের মৃতদেহ দেখার জন্য ছাত্র-জনতার ভিড় জমে গেল। সদ্য কৈশোর পেরুনো তিন তরুণ ও সেখানে গিয়েছিলেন। হাসপাতালের বারান্দায় রক্তাক্ত শহীদ রফিকের মাথার খুলিহীন মৃতদেহ দেখে সেদিন ঢাকা কলেজের এক ছাত্রের ভাবান্তর হলো অন্যরকম। তাঁর মনে হলো, রফিক তো আমার ভাইও হতে পারত । মনের ভেতর তৈরি হলো তাঁর কবিতার দুটি লাইন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি। বন্ধুদের তাগদায় সেই দুই লাইন থেকে জন্ম নিলো দীর্ঘ কবিতা। সেদিনের কলেজ পড়ুয়া মাত্র আঠারো বছর বয়সী ওই তরুণের নাম, আবদুল গাফফার চৌধুরী। সাথের দুই বন্ধু ছিলেন বর্তমানে অধ্যাপক রফুকিল ইসলাম এবং যায় যায় দিনের সম্পাদক শফিক রেহমান।

‘’আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’’ অমর গানটির গীতিকার আব্দুল গাফফার গাফফার চৌধুরী জানালেন কেমন করে একটি কবিতা হয়ে উঠেছিল প্রেরণা উজ্জ্বিবীত মন্ত্রের গানে।

৫২-র ২১শে ফেব্রুয়ারির সেদিনের বিকালে হাসপাতাল থেকে ফিরে দেখেন ঢাকা কলেজের হোস্টেল বন্ধ ঘোষণা করা হয়ে গেছে। কোথায় যাওয়ার জায়গা নেই এদিক সেদিক ঘুরাফিরা করে বন্ধু শফিক রেহমানের বাসায় গিয়ে উঠেন। শফিক রেহমানের বাবা সাইদূর রহমান তখন ছিলেন ঢাকা কলেজের হোস্টেল সুপারিন্টেন্ড। সেখানে থাকা অবস্থায় কবিতাটা অর্ধেক লেখা হয়ে যায়। শফিক রেহমানের বাসা ছেড়ে, সেখান থেকে আরেক বন্ধু দাউদ খান মজলিশ যিনি বংশাল রোডে গিয়ে উঠেন। গাফফার চৌধুরী তাঁর সাথে তখন সংবাদে একসাথে চাকরী করতেন। দাউদ খান মজলিশের বাসায় বসেই পুরো কবিতাটা শেষ করেন । কবিতাটা ছাপা হবে ভাবেন নি গাফফার চৌধুরী, কারণ ছাপানোটা তখন ছিল বিপদজনক। কারণ সে সময় ১৪৪ ধারা, কারফিউ চলছে, যারা ছাত্র আন্দোলনে জড়িত তাঁদের গ্রেফতার করা হচ্ছিল। তখন একদিন আহমদ হোসেন নামে আরেক বন্ধুর সাথে দেখা তাঁর তাগদায়ই কবিতাটি তাড়াতাড়ি শেষ করতে হয়েছিল।

আব্দুল্লাহ আল মুতি শরফুদ্দীন তখন বামপন্থী নেতা ছিলেন , উনারা একদিন গেন্ডারিয়া জঙ্গলের ভিতর এক গোপন সভা ডেকেছিলেন সেখানে প্রথম কবিতাটি আবৃত্তি করেন রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী আতিকুল ইসলাম। তখন গোপন লিফলেটে কবিতাটি ছাপা হয়েছিল।গাফফার চৌধুরী নিজে ও বাম ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন সে সময়।
আতিকুল ইসলাম কবিতাটি নিয়ে যান বিখ্যাত সুরস্রষ্টা আব্দুল লতিফের কাছে। আব্দুল লতিফ গানটিতে সুরারোপ করেন । পরের বছর ১৯৫৩ সালে প্রথম, ঢাকা কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের অভিষেক অনুষ্ঠানে গানিটি গাওয়া হয়। এই গান গাওয়ার অপরাধে ১১ জন ছাত্রকে ঢাকা কলেজ থেকে সে সময় বহিষ্কার করা হয়েছিল । তাঁর মধ্যে গাফফার চৌধুরী ও ছিলেন। কলেজের বহিষ্কার আদেশের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানি ও শেখ মুজিবুর রহমান ( তখনো বঙ্গবন্ধু হননি) যুক্ত বিবৃতি দেন ও প্রতিবাদ জানান। যার ফলে ঢাকায় ছাত্র আন্দোলন বেগবান হয় এবং বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। তবে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটি নিষিদ্ধ করা হয়। হাসান হাফিজুর রহমানের ২১ শে সংকলনে কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সংকলনটি ও সে সময় নিষিদ্ধ করা হয়।

১৯৫৪ সালে আলতাফ মাহামুদ করাচী থেকে চলে আসেন ঢাকায়। গাফফার চৌধুরীর সহপাঠী বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হান কে নিয়ে একদিন তাঁর বাসায় আসেন, এবং নতুন ভাবে তিনি গানটিতে সুরারোপ করতে চান বলে জানান।

গাফফার চৌধুরী বলেন, ‘’লতিফ ভাই যদি আপত্তি না করেন আমার তো কোন আপত্তি নেই’’। আব্দুল লতিফ খুশীমনে নতুন সুরের জন্য অনুমতি দেন।মূলত চার্চের গানের আদলে আলতাফ মাহমুদ মুখের হামিং টা তৈরি করেন। গানটি খুব জনপ্রিয় হয়। এবং ঢাকায় প্রভাত ফেরীর গান হিসাবে প্রচলন হয়। পরে জহির রায়হান তাঁর জীবন থেকে নেয়া ছবিতে গানটি ব্যবহার করেন।

অমর গানটি লিখার প্রস্তুতি সম্পর্কে বলেন, কিশোর বয়সে এই অমর গান লিখার মতো কোন প্রস্তুতি আমার ছিলনা। গান লিখাও জানতামনা আমি। মনের আবেগ থেকে কবিতা হিসাবেই লিখেছিলাম ।

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী
আমি কি ভুলিতে পারি
ছেলেহারা শত মায়ের অশ্রু-গড়া এ ফেব্রুয়ারী
আমি কি ভুলিতে পারি
আমার সোনার দেশের রক্তে রাঙানো ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি।।
জাগো নাগিনীরা জাগো নাগিনীরা জাগো কালবোশেখীরা
শিশুহত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা,
দেশের সোনার ছেলে খুন করে রোখে মানুষের দাবী
দিন বদলের ক্লান্তি লগনে তবু তোরা পার পাবি?
না, না, না, না, খুন রাঙা ইতিহাসে শেষ রায় দেওয়া তারই
একুশে ফেব্রুয়ারী একুশে ফেব্রুয়ারী।।
দেদিনো এমনি নীল গগনরে বসনে শীতের শেষে
রাত জাগা চাঁদ চুমো খেয়েছিল হেসে;
পথে পথে ফোটে রজনীগন্ধা অলকানন্দা যেন,
এমন সময় ঝড় এলো এক, ঝড় এলো ক্ষ্যাপা বুনো।।
সেই আধাঁরে পশুদের মুখ চেনা
তাহাদের তরে মায়ের, বোনের, ভায়ের চরম ঘৃণা
ওরা গুলি ছোঁড়ে এদেশের প্রাণে দেশের দাবীকে রোখে
ওদের ঘৃণা পদাঘাত এই বাংলার বুকে
ওরা এদেশের নয়,
দেশের ভাগ্য ওরা করে বিক্রয়
ওরা মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শান্তি নিয়েছে কাড়ি
একুশে ফেব্রুয়ারী একুশে ফেব্রুয়ারী।।
তুমি আজ জাগো তুমি আজ জাগো একুশে ফেব্রুয়ারী
আজো জালিমের কারাগারে মরে বীর ছেলে বীর নারী
আমার শহীদ ভাইয়ের আত্মা ডাকে
জাগে মানুষের সুপ্ত শক্তি হাটে মাঠে ঘাটে বাঁকে
দারুণ ক্রোধের আগুনে জ্বালবো ফেব্রুয়ারী
একুশে ফেব্রুয়ারী একুশে ফেব্রুয়ারী।।

১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পর। গৌরবোজ্জ্বল এই দিবসের মর্যাদা আজ বিশ্বময়। সারা পৃথিবী আজা জানে মায়ের ভাষায় কথা বলার দাবীতে আত্মাহুতির রক্তাক্ত ইতিহাসের কথা। গর্বের কথা। দেশে দেশে নির্মিত হচ্ছে শহীদ মিনার। নানা ভাষার মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে সেখানে সমবেত হন। একুশ আজ আমাদের সংগ্রামও জাতীয় মর্যাদাকে বিশ্বদরবারে সমুন্নত করেছে। বাঙালির ও বাংলাদেশের একুশ এখন সারা বিশ্বে প্রধান ও অপ্রধান মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার ভাষার মানুষের জন্য মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপনের দিন। একুশ এখন সারা বিশ্বে ভাষা ও অধিকারজনিত সংগ্রাম ও মর্যাদার প্রতীক। একুশ মানে মাথা নত না করার প্রত্যয়। আর তাঁর সাথে সমুজ্জ্বল অমর গান খানি।

profilepic

ব্লগার এবং সাংবাদিক। বর্তমানে লন্ডন থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক ব্রিকলেন পত্রিকার বার্তা সম্পাদক। রাজনীতিতে ও যুক্ত আছেন কলেজ জীবন থেকে।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।