বাংলাদেশ বিমানের অন্ধযাত্রা

অসীম চক্রবর্তী

অসীম চক্রবর্তী

সংস্কৃতি কর্মী এবং পিএইচডি গবেষক। কবিতা, ইতিহাস, রম্য সাহিত্য এবং রাজনীতির প্রতি বিশেষ অনুরাগী।

একদা চার অন্ধ হস্তি দর্শনে গমন করিয়া ছিল ।এ ধরনের একটি গল্প আমরা প্রায় সবাই পড়েছি । কিন্তু আজকে বলব ভাস্কর ভট্টাচার্য নামের একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সমাজ কর্মীর বিমান ভ্রমণ কাহিনী। “বিমান বাংলাদেশে আপনাকে স্বাগতম” বললেও আসলে তারা কতোটা স্বাগত জানায় তাদের গ্রাহকদের সেটাই মূলত আজকের প্রতিপাদ্য।

ফেইসবুক পোস্টের স্ক্রিনশটগল্পের চার অন্ধ হস্তি দর্শনে বের হলেও আমাদের আজকের বাস্তব ঘটনা ভিন্ন । আমাদের এই বাস্তব ঘটনার প্রধান চরিত্র ইপসা’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ভাস্কর ভট্টাচার্য । গতবছর চব্বিশে ফেব্রুয়ারি ভাস্কর ভট্টাচার্য ঢাকা থেকে চিটাগাং যাওয়ার জন্য বিমানের টিকেট কিনতে যান ।কথাবার্তার এক পর্যায়ে যখন বিমান অফিসের লোকজন জানতে পারলো তিনি একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী । তৎক্ষণাৎ তারা উনাকে জানালো বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স’র এক বিরল নিয়মের কথা । যে নিয়মে বলা হয়েছে যে একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী একা বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্সে ভ্রমণ করতে পারবেনা । এধরনের উদ্ভট নিয়মের কথা শুনে রাগে ক্ষোভে হকচকায়ে গেলেও বিষয়টা সামলে নিয়ে তিনি ফোন করে বসেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জনাব রাশেদ খান মেননের কাছে । উত্তরে মন্ত্রী মহোদয় বলেন টিকেট কনফার্ম করে উনাকে ক্ষুদে বার্তায় ফ্লাইট নাম্বার জানিয়ে দেওয়ার জন্য।

মন্ত্রী মহোদয়ে কথা অনুযায়ী ভাস্কর ভট্টাচার্য ফ্লাইটের বিস্তারিত বিবরণ (BG 044 T MOO2MAR CGPDAC HKI 0955 ) পাঠান । কথায় আছে হস্তীকে আজকে কাতুকুতু দিলে একমাস পরে উহার হাসির উদ্রেক হয় । একবছর গত হওয়ার পরেও মন্ত্রী মহোদয়ের উত্তর না পাওয়া ভাস্কর বাবুকে বোধ করি মাস খানেক অপেক্ষা করতেই হবে ।

মানবতার জয়গানে জয়জয়কার আমাদের এই একবিংশ শতাব্দী । সমগ্র বিশ্ব এখন প্রতিবন্ধী মানুষদের চলাফেরার রাস্তা সহজ থেকে সহজতর করছে । সেখানে বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্সের এহেন মান্ধাতার আমলের পুরাতন উদ্ভট নিয়ম আমাদের ঠেলে দেয় মধ্যযুগের দিকে ।

বিশ্বের অন্যতম এভিয়েশন সার্ভিস ব্রিটিশ এয়ার লাইন্স প্রতিবন্ধী গ্রাহকদের জন্য রেখেছে বিশেষ সেবা সমূহ । একজন প্রতিবন্ধী প্যাসেঞ্জার বোর্ডিং কার্ড হাতে পাওয়ার পরে বিমানে উঠা থেকে শুরু করে ব্যাগেজ রাখা, সিট বেল্ট পরিয়ে দেওয়া , পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া, টয়লেটে যাওয়া, ঔষধ খাওয়ানো, খাবারের প্যাকেট খোলে দেওয়া, প্রয়োজনে খাইয়ে দেওয়া সহ যাবতীয় সবকিছু । একই ধরনের সেবা সমূহের নিদর্শন পাওয়া যায় অন্যতম এভিয়েশন সার্ভিস কোম্পানি এমিরেটস এয়ার লাইন্সের ওয়েব সাইটেও ।

International Aviation Transport Association এর নিয়ম অনুযায়ী যে সকল প্রতিবন্ধী যাত্রীর এয়ারপোর্টে বা প্রবেশ/বহির্গমনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বিশেষ সহায়তা (special assistance ) প্রয়োজন তাদের জন্য কোন মেডিক্যাল ছাড়পত্র বা বিশেষ ফর্ম পূরণের প্রয়োজন নেই। এই নিয়মে আরও বলা আছে যে, একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তার সাথে যদি কোন কুকুর থাকে যে তাকে চলাচলে সহায়তা করে, তাকেও ফ্লাইটে নেয়ার অনুমতি দিতে হবে। অথচ কি উদ্ভট নিয়ম আমাদের জাতীয় আকাশ পরিবহন সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স’র যেখানে খোদ দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদেরকেই নিষিদ্ধ করে রেখেছে একা বিমান ভ্রমণে । শারীরিক ভাবে সক্ষম মানুষের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রতিবন্ধীরাও এগিয়ে চলেছে আজকের বিশ্বে । শত শত পালক যুক্ত করছে আধুনিক মানব সভ্যতার মুকুটে । যে কয়জন বিশ্ব সেরা বিজ্ঞানী আমাদের এই পৃথিবীকে আধুনিক থেকে আধুনিকতর করতে অবদান রেখে গেছেন কিংবা রাখছেন তার মধ্যে সেরা পাঁচ জন বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন(Asperger’s Syndrome (a type of Autism and it is also thought he was dyslexic) , স্টিফেন হকিং(ALS), আইজ্যাক নিউটন(epilepsy), থমাস এডিশন(learning disability) এবং জন ফরবেস ন্যাস(Schizophrenia) যে ব্যক্তিগত জীবনে নানা ধরনের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কাটিয়েছেন সেটা আমাদের বিমান মন্ত্রণালয়ের হয়ত জানা নেই । আমাদের বিমান মন্ত্রণালয়ের হয়তো আরও জানা নেই যে ব্রিটেনের শতকরা একশ জন প্রতিবন্ধীদের মধ্যে ৪৬.৩ জন মানুষ কাজ করে জীবন নির্বাহ করে।দেশটির ৮৮% বাসে হুইলচেয়ার নিয়ে আরোহণ এবং ভ্রমণ সম্ভব।

দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সাথে বৈষম্যমুলক আচরণ করা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জানা নেই যে বিশ্বে অগুনতি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ তাদের কৃতকর্মে দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষের চেয়েও সফল । আমাদের সমাজের অনেক দৃষ্টি জ্ঞান সম্পন্ন মানুষের অসদাচরণ আর দুর্নীতির ভিড়ে দৃষ্টিহীনের বিমান ভ্রমণে বাঁধা দেওয়া নিছক অর্বাচীনের প্রলাপ মনে হচ্ছে ।

নানা ধরনের উদ্ভট নিয়ম অব্যবস্থাপনা আর দুর্নীতির জন্য বছরের পর বছর ধরে আমাদের জাতীয় এই আকাশ পরিবহন সংস্থা লাভের মুখ দেখতে পারেনি । বরং ক্ষতির পরিমাণ ছিল হাজার হাজার কোটি টাকা ।অথচ হালাল খাদ্য আর দেশী বিমানে ভ্রমণের জন্য আন্তর্জাতিক রুটে বিমানের অবস্থান থাকার কথা ছিল অপ্রতিরুদ্ধ । কিন্তু দুঃখের বিষয় যাত্রী হয়রানি, ফ্লাইট বিলম্ব এবং কেবিন ক্রুদের দুর্ব্যবহারের জন্য যদি বিশ্বের বিমান সংস্থা গুলোর মধ্যে জরিপ চালানো হয় তবে আমাদের বিমান বাংলাদেশ এয়ার লাইন্স নিশ্চিত সেরা পাঁচের মধ্যে থাকবে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় যেখানে দেশে প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটছে ঠিক সেই সময়ে আমাদের বিমান মন্ত্রণালয় যখন ঘাপটি মেরে থাকে মান্ধাতার আমলের বৈষম্য-পূর্ণ নীতিমালা নিয়ে তখন আর কিছুই বলার থাকেনা । মাননীয় মন্ত্রী, ভাস্কর ভট্টাচার্য’র মাধ্যমে পুরানো বিমানের রুগ্ন কংকালকে ভেঙ্গে নব দিগন্তের সূচনা করুন । আন্তর্জাতিক রুটে বিমানকে বাঁচিয়ে রাখতে সেবার মান এবং ফ্লাইটের সময়কে প্রাধান্যদান ।প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ সেবার ব্যবস্থা করুন ।

প্রতিবন্ধীরাও বাংলাদেশের নাগরিক । একজন শারীরিক সক্ষম মানুষের মত এই দেশে তাদের অধিকারও সমান ।

দেশের মানুষ দেশী বিমানে ভ্রমণ করে গর্ব করুক । এইভাবে দেশের টাকা নষ্ট করে বিমানকে ভাগাড়ে পরিণত পুরানো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দৃষ্টান্ত স্থাপন করাটাই হচ্ছে ভিন্ন ভাবে বেঁচে থাকা ।

Featured Photo: Street candid taken in Glasgow, Scotland. It has to be said that the Gallery of Modern Art in Glasgow does have excellent disabled access and there are ramps either side of the main entrance. This does, however, make for quite an illustrative image though and one I simply had to capture.

profilepic

সংস্কৃতি কর্মী এবং পিএইচডি গবেষক। কবিতা, ইতিহাস, রম্য সাহিত্য এবং রাজনীতির প্রতি বিশেষ অনুরাগী।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।