রাষ্ট্রের ধর্ম না ধর্মের রাষ্ট্র মুখোশের আড়ালে বাংলাদেশ

জুয়েল রাজ

জুয়েল রাজ

ব্লগার এবং সাংবাদিক। বর্তমানে লন্ডন থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক ব্রিকলেন পত্রিকার বার্তা সম্পাদক। রাজনীতিতে ও যুক্ত আছেন কলেজ জীবন থেকে।

১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র। এই ভিত্তির উপরে ভর করে যাত্রা শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশের।

একদম বইয়ের ভাষায় বললে , নির্দিষ্ট ভূ-খন্ড, জনসমষ্টি, সরকার ও সার্বভৌম ক্ষমতা এ চারটি উপাদান নিয়ে রাষ্ট্র গঠিত, সরকার হলো রাষ্ট্রের একটি উপাদান। রাষ্ট্রে শাসন কাজ পরিচালনার জন্য যাঁরা নিয়োজিত থাকেন তাঁদের সমষ্টি হচ্ছে সরকার।

গ্রীক দার্শনিক এরিস্টটলের মতে, “রাষ্ট্র হলো কয়েকটি পরিবার ও গ্রামের সমষ্টি, যার উদ্দেশ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন।” মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলসন এর ভাষায়, “মানবজাতির অংশ বিশেষকে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধভাবে দেখা গেলে তাকে রাষ্ট্র বলে।” ব্রুন্টসলী বলেন, “কোন নির্দিষ্ট ভূখন্ডে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত জনসমাজই রাষ্ট্র।”

এই সমস্ত সংজ্ঞা কোনোভাবে কি রাষ্ট্রের ধর্ম বা ধর্মীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পর্কে বলে কিছু? তবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুশাসনের বিষয়টি রাষ্ট্র মেনে চলে। টি. এইচ. গ্রিন বলেন, “রাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত অধিকার এবং বাধ্যবাধকতাসমূহ আইন।” হল্যান্ড বলেন,” আইন হচ্ছে মানুষের বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণের কতকগুলো সাধারণ নিয়ম, যা সার্বভৌম শক্তি কর্তৃক প্রণীত হয়।” উড্রো উইলসন বলেন,”আইন হলো সমাজের সেই সকল প্রতিষ্ঠিত প্রথা ও রীতিনীতি যেগুলো সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত এবং যা সরকারের অধিকার ও ক্ষমতার দ্বারা বলবৎ করা হয়।”

আইনের বিভিন্ন উৎস রয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হল্যান্ড আইনের ৬টি উৎসের কথা বলেছেন। এগুলো হলঃ প্রথা, ধর্ম, বিচার সংক্রান্ত রায়, বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা, ন্যায়বোধ ও আইনসভা।

রাষ্ট্রের এই চিরায়িত সংজ্ঞা ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধানকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে, বন্ধুকের নলের মুখে ক্ষমতা দখলকারী সাবেক স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৮ সালের ৫ জুন চতুর্থ জাতীয় সংসদে অষ্টম সংশোধনী আনা হয়। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অনুচ্ছেদ ২-এর পর ২(ক) যুক্ত হয়। ২(ক)-তে বলা হয়, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম হবে ইসলাম।’ যদিও বহুদলীয় গণতন্ত্রের নাম করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল কারী বন্দুকধারী জেনারেল জিয়াউর রহমান জামায়াত ইসলাম সহ বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষের শক্তিকে রাষ্ট্র ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন।

১৯৮৮ সালেই রাষ্ট্রধর্মের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই বছরের আগস্ট মাসে ‘স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটির’ পক্ষে সাবেক প্রধান বিচারপতি কামালউদ্দিন হোসেন, কবি সুফিয়া কামাল, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন।

দীর্ঘ ২৮ বছর পর সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে সংবিধানে অন্তর্ভূক্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আনীত রিট মামলাটি শুনানীতে আসায় বিষয়টি এখন আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম ও ত্রয়োদশ সংশোধনী সংসদে অনুমোদিত হলেও সুপ্রিম কোর্ট এসব সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেছে। সেই হিসাবে রাষ্ট্রধর্মের বিষয়টি সেখানেই নিষ্পত্তি ঘটে যায়।

কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে সংবিধান সংশোধনে সংসদীয় বিশেষ কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রাখার সুপারিশ করে। পরবর্তীকালে ওই সুপারিশ অনুযায়ী সংবিধানে আনা হয় পঞ্চদশ সংশোধনী।
২০১১ সালের ৩০ জুন এ সংশোধনী আনা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলোপের পাশাপাশি অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের জন্য রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ বিবেচনায় সর্বোচ্চ দণ্ডের বিধান রাখা হয় এ সংশোধনীতে।

এছাড়া এ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭২’র সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু সাপ মেরে লেজে বিষ রাখার মতোই রাষ্ট্রধর্মের বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়।

এই সংশোধনীতে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে বহাল রাখার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি সম্পূরক আবেদন দাখিল করে রিটকারী পক্ষ। আবেদনে বলা হয়, সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম (আংশিক) ও ত্রয়োদশ সংশোধনী সংসদে অনুমোদিত (পাস) হলেও সুপ্রিম কোর্ট এসব সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করেছে। রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে স্বীকৃতির বিধান সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ের আলোকে ১৯৭২ সালের সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র সংবিধানে ফিরে এসেছে। আদি সংবিধানের ১২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল হয়েছে। এটির সঙ্গে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম অব্যাহত রাখা হলে তা হবে সাংঘর্ষিক ও পঞ্চম সংশোধনীর মামলার রায়ের পরিপন্থী।

১৯৮৮ সালে করা আবেদনের মূল কথা ছিল রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করার মাধ্যমে সংবিধানের অসাম্প্রদয়িক চরিত্রকে ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে৷ এর মাধ্যমে একটি মাত্র ধর্মকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে বাংলাদেশে।

অন্য ধর্মের লোকদের ওপর হামলার কারণে বাংলাদেশে রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা হারাতে পারে ইসলাম। সম্প্রতি ইংল্যান্ডের ‘দ্য ইনডিপেনডেন্ট’ পত্রিকা এমনই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রত্রিকাটি জানায়, বাংলাদেশে সম্প্রতি সংখ্যালঘু খ্রিস্টান, হিন্দু ও মুসলিমরা হামলার শিকার হয়েছে। ইসলামিক জঙ্গী গোষ্ঠী এ হামলা চালিয়েছে।
১৯৮৮ সাল থেকে ইসলাম বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে অনেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে মানতে চাচ্ছেন না। তাঁরা বলছেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করা অবৈধ।

পত্রিকাটির খবরে আরো বলা হয়, যেখানে ৯০ শতাংশ লোকের ধর্ম ইসলাম, সেখানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম থেকে অপসারণের দাবি কতদূর বিস্তৃত হবে সেটা স্পষ্ট নয়।

ডঃ আব্দুল করিম জায়দানের ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা নামক প্রবন্ধে ইসলামী রাষ্ট্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেছেন- “তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তাই, যা প্রমাণিত ও স্বতপ্রকাশিত হয় তার প্রকৃতি থেকে। তা যতদিন একটি আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্র থাকবে, ততদিন তা থাকবে ইসলামী আদর্শ ও বিধানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কাজেই অতি স্বাভাবিকভাবেই সে রাষ্ট্রের লক্ষ্য হবে তাই যা ইসলামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এ কারণে নাগরিকদের জন্যে শুধু শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান এবং তাদের জীবন সংরক্ষণ ও বহিরাক্রমণ প্রতিরোধ পর্যন্তই তার উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও দায়িত্ব সীমিত হয়ে যেতে পারে না। বরং রাষ্ট্রের সর্বদিকে সর্ব ব্যাপারে ও সর্ব ক্ষেত্রেই ইসলামী আইন বিধান পূর্ণ মাত্রায় কার্যকরী করা, জারি করা এবং মানব সমাজের সর্বস্তরে ইসলামী দাওয়াত পৌঁছে দেয়াও তার উদ্দেশ্য, লক্ষ্য এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত। সেই সাথে ইসলামী আকীদা মোতাবেক ব্যক্তিগণকে আল্লাহর বন্দেগী করা, বৈষয়িক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য লাভ এবং ইসলামী বিধান মোতাবেক বাস্তব পূর্নাঙ্গ জীবন যাপনের অবাধ সুযোগ সুবিধে করে দেয়াও তার কাজ। ইসলামের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা, শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকদের মন-মগজ ও মানসিকতা এবং স্বভাব-চরিত্র ও আচার-আচরণকে ইসলাম অনুরূপ বানিয়ে দেয়াও তার বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এখানেই শেষ নয়, ইসলামী আদর্শের বিকাশদান ও তা অনুসরণ করে চলার পথে যত প্রকারের প্রতিবন্ধকতা হতে পারে তার সব দূর করা, ইসলাম বিরোধী চিন্তা, সমাজ ও অর্থনীতি সম্পর্কীয় মতের প্রতিরোধ করাও তার কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত।”

রাষ্ট্র ধর্মের বিষয়টি তাই বাংলাদেশের জন্য লেজে-গোবরে অবস্থাই বলা যায়। যে ধারণার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্ম ও পথচলা সেখান থেকে উল্টা পথে যাত্রা শুরু করেছে বাংলাদেশ। পৃথিবীতে বর্তমান ধর্মীয় রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে সেটা পরিস্কার বুঝা যায়।
বাংলাদেশের বাক স্বাধীনতা বা মুক্তবুদ্ধ্বির চর্চা আজ হুমকির সন্মুখীন। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন নিপীড়ণের মূল কারণও এই ধর্মীয় রাষ্ট্র চিন্তা। একটা প্রজন্ম যখন বেড়েই ওঠে রাষ্ট্রীয় ভাবে অন্য ধর্মকে অস্বীকার করে , তখন অন্য ধর্ম বা মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকার কথা না। তার মনোজগতে অবশ্যই এর প্রভাব পড়ে।

ভোটের রাজনীতির কারণে আওয়ামী লীগও বিষয়টিতে হাত দেয়ার সাহস করেনি হয়তো। কাগজে-কলমে রাষ্ট্রধর্ম বাতিল হলেই কি সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ হয়ে যাবে? এমন প্রশ্নও অনেকে করেন। খুব সহজে বা তাড়াতাড়ি হয়তো সেটা ঘটবে না। যেমন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, শহীদের সংখ্যা বিতর্ক বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার মিথ্যাচার থেকে স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও বের হয়ে আসেনি বাংলাদেশ। কিন্তু সেদিন খুব বেশী দূরে নয় যেদিন এসব নিয়ে আর কোনো বিতর্কের কোন সুযোগ থাকবে না। কেউ করারও সাহস পাবেনা। তেমনি সংবিধান বা রাষ্ট্র যখন তার ধর্মীয় লেবাস পাল্টে বেরিয়ে আসবে তখন অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠবে। মুক্তিযুদ্ধ্বে অর্জিত সত্যিকারের বাংলাদেশ হবে। ধর্মও যৌনতার মতো একান্তই মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতার বিষয় নয়। ব্যক্তিগত ধর্ম পরিবর্তনশীল। চাইলেই একটা মানুষ তার ধর্ম বিশ্বাস পরিবর্তন করতে পারে। ধর্মের বিলুপ্তি ঘটাতে পারে। রাষ্ট্রের নয়। বাংলাদেশ ধর্মের মুখোশ পরে আছে। ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা কোনোভাবেই বাংলাদেশের মানুষ ও তাঁদের আদর্শের সাথে যায় না। দেশের সর্বোচ্চ আদালত যেহেতু রাজনৈতিক দল নয়, তাকে ভোটের হিসাবনিকাশ করতে হয়না, সংবিধান ও রাষ্ট্রের শেষ আশ্রয় হিসাবে সেই আদালত বন্দুকের নলের মুখে চাপিয়ে দেয়া ব্যবস্থা থেকে মুক্তি দেবে বাংলাদেশকে সেটাই প্রত্যাশা।

profilepic

ব্লগার এবং সাংবাদিক। বর্তমানে লন্ডন থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক ব্রিকলেন পত্রিকার বার্তা সম্পাদক। রাজনীতিতে ও যুক্ত আছেন কলেজ জীবন থেকে।


একটি প্রতিক্রিয়া হতে “রাষ্ট্রের ধর্ম না ধর্মের রাষ্ট্র মুখোশের আড়ালে বাংলাদেশ”

  1. abdul Momin

    তুমি আইন বুঝ না ইসলাম বুঝ? তোমার জন্মদাতা কে ? তুমি তো চোখে দেখোনি . শুধু বিশ্বাস ও মায়ের কথা শুনেছো. DNA test not prove real birth history. yet like modern science

    জবাব

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।