পাথরঘাটা যেনো ইতিহাস আর প্রকৃতির মিলনের ধ্রুপদী সংগীত!

দেবী সরকার

দেবী সরকার

আইনজীবি ও মানবাধিকার কর্মী। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্ণধার যা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও আদিবাসিদের নিয়ে কাজ করে। বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী।

পাথরঘাটা, এখানে এলে চোখের সামনে জীবন্ত হবে পালরাজাদের গৌরবমণ্ডিত ইতিহাসের জলরঙ।কালের আর্বতে রাজাদের রাজ্যপাট প্রকৃতির দেখলে চলে গেছে।প্রায় দুমাইল জায়গা জুড়ে ছড়ানো ইতিহাস আর প্রকৃতির মিলনের ধ্রুপদী সংগীত এই দৃষ্টিনন্দন স্থান ।কালের নিরব সাক্ষী এক একটা মহীরুহ,বিশাল ডালপালা ছড়িয়ে অভিজাত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে,নির্বাক, ধ্যানমগ্ন।যেনো সংসারের মায়া উপেক্ষা করা তথাগত,কনো কিছুর মোহ তাদের এই ধ্যান ভাঙ্গাতে পারবে না।গাছগুলোর প্রাচীন শরীরে সময়ের স্রোত জমে জমে কালচে সবুজ শ্যাওলায় রুপান্তরিত হয়েছে ।গাঢ় সবুজ শাখাপ্রশাখায় অন্ধকারের আবেশ।এই জায়গাটার মাটি ঘন কৃষ্ণবর্ণ।

কালো মাটি নরম সবুজ ঘাসে ঢেকে আছে।দেখে মনে হবে আনমনে ভুলে কেও একটা সবুজ কাশ্মীরি গালিচা পেতে চলে গেছে।ঝুপঝাপ নিস্তব্ধতা নামে এখানে দিনভর।শুনসান হয়ে যায় চারপাশ।বৃক্ষরাজিকে পাশ কাটিয়ে আপন মনে বয়ে গেছে ছোট্য নদী তুলশীগঙ্গা। তুলশীগঙ্গায় বছরের অধিকাংশ সময় তেমন একটা জল থাকেনা,কিন্তু বর্ষা এলে এই তুলশীগঙ্গাকে আর চেনা যায় না, দুকূল ছাপিয়ে বন্যা আসে,সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়।সারাবছর শান্তশিষ্ট পাশের বাড়ীর মিষ্টি মেয়ে থেকে সে রাতারাতি কূলভাঙ্গার ব্রতে সর্বনাশী ওঠে। আশ্চর্য!

এখানে ঝাঁকেঝাঁকে সবুজ টিয়ার ঘরবসতি। দিনমান ভিষন ব্যাস্ত তারা,তাদের হাতে একটুও সময় নেই,এদিকে ওদিকে উড়াউড়ি,রাজ্যের কাজের ঠিকাদারি তাদের।জগৎসংসারে সব কাজের ভার তাদের ছোটছোট কাঁধে।টিয়াগুলো দলবেঁধে সবাই একে অন্যের সাথে কথা বলতে শুরু করে,চুপ করে বসে তাদের কিচিরমিচির শুনতে ভালোলাগে।পাখিগুলো থেমে গেলেই ঝপ করে নিস্তব্ধ হয়ে যায় পুরো জায়গাটা।

তখন পুরনো ইতিহাস উঠে আসেতে চায় মাটি খুঁড়ে।লোকমুখে প্রচলিত এটা পালরাজা প্রথম মহীপালের (৯৮৮-১০৮৩)এক রানীর রাজপ্রাসাদ ছিল,রানী ছিলেন রাজার খুব প্রিয়।সেই রানী জোছনা রাতে সখীদের নিয়ে তুলসীগঙ্গা নদীতে স্নান করতে ভালোবাসতেন,তাই এই জায়গাকে সতীঘাটাও বলেন অনেকে।


সময়ের স্রোতে হারিয়ে গেছে সবকিছু,দুর্দান্ত প্রতাপশালী রাজ নেই,নেই তার প্রিয়তমা রানীও,মাটি আঁকড়ে থেকে গেছে ইতিহাসের ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু অংশ।বড়বেশি বিষন্ন মলিন সেটা। জরাজীর্ণ রাজপ্রসাদের প্রাচীরটা এখনও কোনোমতে টিকে আছে।একটা প্রায় অদৃশ্য সিঁড়ির রেখা প্রাসাদ থেকে নদীতে নেমে গেছে,আছে মিঠা পানির কূপ,অনেক লম্বা লম্বা পাথর খন্ড,আর পুরনো গাছপালা।শোনা যায় রাজা নাকি ভিষন সৌখিন ছিলেন,তাঁর অর্থ সম্পদের কনো অভাব ছিলোনা,চারপাশে ছড়ানো গ্রানাইট পাথর খন্ড গুলো সে কথাই মনে করিয়ে দিবে।প্রতিটা পাথরখন্ড একটা আরেকটার থেকে আলাদা,কনোটাতে আছে ফুল লতাপাতার ছবি,কনোটাতে মানুষের।এখনও আশেপাশের গ্রামগুলোতে মাটি ঘুঁড়তে গিয়ে পোড়ামাটির পুতুল,তৈজসপত্র পাওয়া যায়।

পাথরঘাটার একটা অসাধারণ বিশেষত্ব হলো এখানে তিন ধর্মের উপাসনালয় আছে ।তুলসীগঙ্গা নদীর এক তীরে আছে হিন্দুদের রাধামাধব মন্দির,আর মহাশশ্মান,অন্যতীরে মুসলিম পীরের মাজার,আর কিছুদূর এগুলেই খৃষ্টো ধর্মাবলম্বীদের গীর্জা।

প্রতি বছর চৈত্রসংক্রান্তিতে এখানে মেলা বসে,বারুনী স্নানের তিথি ধুমধাম করে পালন করা হয়।সিন্নি দেয়া হয় মাজারেও। অনেক দুরদুরান্ত থেকে সব ধর্মের মানুষেরা আসেন নিজ নিজ মনোবাঞ্ছা পুরনের আকাক্ষা নিয়ে।
পাথরঘাটার চারপাশ ঘিরে আছে আদিবাসীদের গ্রাম।সাঁওতাল,মালো, উঁরাও,মাহাতো সম্প্রদায়ের লোকেরা কয়েক প্রজন্ম থেকে এই এলাকাতে বসবাস করেন।

খুব সাধারন জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই মানুষ গুলোর ব্যাবহার মুগ্ধ করে ফেলবে সহজেই।আর আছে মাইলের পর মাইল জুড়ে সবুজ মাঠ।

অদ্ভুত সুন্দর এই জায়গাটা জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলা সদর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে।

profilepic

আইনজীবি ও মানবাধিকার কর্মী। একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্ণধার যা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও আদিবাসিদের নিয়ে কাজ করে। বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী।


একটি প্রতিক্রিয়া হতে “পাথরঘাটা যেনো ইতিহাস আর প্রকৃতির মিলনের ধ্রুপদী সংগীত!”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।