অপরাধীর ভুল-স্বীকার ও সুশীল প্রোপাগান্ডা মেশিন

চন্দ্রবিন্দু

চন্দ্রবিন্দু

অচ্যুত বলাই, চোর নামে বাংলাব্লগে ব্লগিং করছেন সেই প্রথম থেকেই।

একটা ফ্লপ গল্পের কথা প্রায় সকলেরই জানা। এক চোর বমাল হাতেনাতে ধরা পড়ার পরে চুরিও স্বীকার করেছে। কিন্তু আদালতে চোরের পক্ষের উকিলের দাবি, সে চুরি করলেও তাকে ক্ষমা করে দিতে হবে, কোনো শাস্তি দেয়া যাবে না। কারণ, আরো হাজার হাজার চোর এই মুহূর্তেই চুরি করে যাচ্ছে। একে শাস্তি দিতে হলে আগে তাদেরকে শাস্তি দিয়ে আসতে হবে। মহামান্য আদালত উকিলের সেই যুক্তিকে আমলে নিলেন কি না, গল্পের সে অংশটি আপাতত মূলতবি রেখে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের সাম্প্রতিক ভুল স্বীকার ও সাংবাদিক মহলের বিরাট অংশের তৎপরবর্তী প্রতিক্রিয়া নিয়ে কিছু বলা যাক।

ভুল, নাকি অপরাধ?
আমাদেরকে প্রথমেই সিদ্ধান্তে আসতে হবে মাহফুজ আনামের কাজটি “ভুল”, নাকি “অপরাধ”। একজন মানুষ কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তার ভুলের জন্য সে যদি শুধুমাত্র একাই দুর্ভোগ পোহায়, তাহলে সেটি তার নিজস্ব সমস্যা। কিন্তু তার ভুলের জন্য যদি অন্য কেউ দুর্ভোগ পোহায়, তাহলে সে ভুলের জন্যও জবাবদিহিতা করতে হয়। মাহফুজ আনাম বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক। তার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের পাঠক শুধু দেশের লাখ লাখ মানুষই নয়; বরং বিদেশিরাও। সুতরাং তিনি যদি ভুল করে কোনো সংবাদ প্রকাশ করেন, তার প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী হতে পারে। এরকম ভুলের জন্য অবশ্যই জবাবদিহিতা কাম্য।

বস্তুত মাহফুজ আনাম শেখ হাসিনাকে দুর্নীতিবাজ সাজিয়ে যে মিথ্যা সংবাদগুলো প্রচার করেছিলেন, সেগুলো ভুল নয়, অপরাধ। অসাবধানতাবশঃত অনিচ্ছাকৃতভাবে দুয়েকবার ভুল হতে পারে। পত্রিকার এরকম ভুলের ক্ষেত্রে সংশোধনীও দেয়া হয়, দ্রুততম সময়ের মধ্যে ক্ষমা প্রার্থনাও করা হয়। ডেইলি স্টার ধারাবাহিকভাবেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে। সে প্রোপাগান্ডার জন্য তারা তখন সংশোধনীও প্রকাশ করে নি, ক্ষমাও চায় নি। সুতরাং তাদের এ অপকর্মকে ভুল হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নেই, এটি একটি অপরাধ। এবং অপরাধের বিচার আদালতে হয়।

মাহফুজ আনাম তো ক্ষমা চান নি
এরপর আসি, মাহফুজ আনাম আদতে ক্ষমা চেয়েছেন কি না, সেই প্রসঙ্গে। মুন্নী সাহার উপস্থাপনাকৃত সেই টক শোতে মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে যখন মাইনাস টুর অভিযোগ আনা হয়, তখন তিনি উলটো রাগান্বিত হয়ে বলেন, এরকম কোনো নিউজ তার পত্রিকায় কখনো ছাপা হয় নি। তিনি বরং এর প্রমাণ দাবি করেন। এমনকি প্রমাণ ছাড়া অভিযোগকারী গাজী নাসিরকে সেই টক শো থেকে উঠতে দেয়া হবে না বলেও শাসান। যখন দিন তারিখ উল্লেখ করে তার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রোপাগান্ডার প্রমাণ দেয়া হয়, তখনো তিনি প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। মুন্নী সাহা আবার প্রসঙ্গে ফিরে তাকে চেপে ধরার পরেই তিনি কোনো উপয়ান্তর না দেখে নিজের “ভুল” স্বীকার করেন।
এভাবে “ভুল”-এর ছদ্মাবরণে “অপরাধ”কে এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেন। সেই সাথে এই ভুলের জন্য তিনি নিজে দায়িত্ব নিতে চান না। বরং ডিজিএফআই তাকে তথ্য সরবরাহ করেছিলো বলে তাদের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করেন। এই প্রক্রিয়ায় তিনি প্রোপাগান্ডার জন্য একবারও ক্ষমা চান নি।

আজ যখন মাহফুজ আনামকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় না করিয়ে আগ বাড়িয়ে ক্ষমা করে দেয়ার দাবি ওঠে, তখন বেশ অবাকই হতে হয়। একই ধরনের অপপ্রচেষ্টা লক্ষ্য করি প্রথম আলো, ডেইলি স্টার গ্রুপের বহুল প্রচারিত রিকনসিলিয়েশন তত্ত্বের ক্ষেত্রেও। তাদের অবস্থা দেখে মনে হয়, পাকিস্তান যদি ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যার জন্য একটি বার “ভুল” স্বীকার করে, তাহলেই তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে সুদীর্ঘ বিরহের পর কেঁদেকেটে আকুল হওয়া উচিত!

মাইনাস টু কি ছেলেখেলা?
মাহফুজ আনামের পক্ষে স্পষ্টভাবে বা ইনিয়ে-বিনিয়ে যতো বক্তব্যই দেখেছি, তার কোথাও মাইনাস টুর ভয়াবহতা নিয়ে কোনো টু-শব্দ নেই। মাইনাস টু কি? সংক্ষেপে, মাইনাস টু হলো, “বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়াই সব নষ্টের মূল। সুতরাং তাদেরকে কিকআউট করলেই সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হবে” – এরকম একটি মতবাদের পক্ষে কাজ করা। এই মতবাদটি যে কতোটা ভয়াবহ, সেটি বুঝতে গণতন্ত্রের মূলে ফিরে যাই। একটি গণতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থায় একজন নির্বাচিত শাসক কখনো কখনো কক্ষচ্যুত হয়ে জনস্বার্থবিরোধী কাজ করতে পারে। এরকমটা হলে তাকে লাইনে আনার দায়িত্বও জনগণের। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৬ এর ১৫ই ফেব্রুআরির নির্বাচনকে জনগণই ঠেকিয়ে দিয়েছিলো। গণতন্ত্রকে লাইনে আনার দায়িত্ব কখনোই সামরিকতন্ত্রের নয়। কারণ, সেক্ষেত্রে জনগণের কোনো অংশগ্রহণই নেই, জনগণের কাছে সামরিক শাসকের জবাবদিহিতা নেই, জনগণের এমনকি আন্দোলন করার স্বাধীনতাও নেই। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সুশীলতন্ত্র প্রায় সবসময়ই সামরিকতন্ত্রের হাত ধরে চলে। স্বার্থের বিনিময়ে একে অন্যের পিঠ রক্ষা করতে তৎপর হয়।

হাসিনা এবং খালেদা খারাপ না ভালো, সেটি নির্ধারণ করার দায়িত্ব জনগণের; সামরিক বাহিনীর নয়, বা কিছু স্বঘোষিত সুশীলেরও নয়। তারা দেশের জন্য ক্ষতিকর হলে জনগণ তাদেরকে ভোট দিবে না, তাদের বিকল্প খুঁজে নিবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের “একমাত্র” দায়িত্ব ছিলো সুষ্ঠুভাবে সেই ভোটের ব্যবস্থা করা। তারা জনপ্রতিনিধি নয়, জনগণ তাদেরকে বলে নি যে, হাসিনা-খালেদাকে মাইনাস করে দাও। জনগণ তাদেরকে বলে নি যে, সবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ ঘোষণা করে ডঃ ইউনুসকে প্রতিষ্ঠিত করে দাও। জনগণ তাদেরকে দায়িত্ব দেয় নি জামায়াতকে “দুর্নীতিমুক্ত” হিসেবে সার্টিফিকেট দেয়ার। মাইনাস টু কখনোই জনস্বার্থ রক্ষা করে না, এটি গুটিকয়েক সুবিধাবাদীর আখের গোছানোর উপায় মাত্র।

বাংলাদেশের ভাগ্য ভালো যে, তাদের সে অপ-পরিকল্পনা সফল হয় নি। সব ধরনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির পরেও জন-সমর্থন পেতে ব্যর্থ হবে দেখে কিংস পার্টিও আর দাঁড়ায় নি, ডঃ ইউনুসের নাগরিক শক্তিও অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, রাজনৈতিক দল গঠন থেকে সরে আসার কারণ হিসেবে ডঃ ইউনুস বলেছিলেন, অন্যান্য দলের অনেক রাজনৈতিক নেতা কথা দিলেও শেষতক তার দলে না আসায়, তিনি দল গঠন করতে ব্যর্থ হয়েছেন! অর্থাৎ, তাদের পরিকল্পনাই ছিলো নোতুন বোতলে পুরোনো মদ সাপলাই দেয়ার। মাঝখানে শুধু কাচের বোতলটারই যতো দোষ! অতএব, বোতলটাকে মাইনাস না করলে চলে না।

১/১১ এর দায় হাসিনার?
সুশীল প্রোপাগান্ডা মেশিনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অবদান হলো, ১/১১ এর দায় শেখ হাসিনার ওপরে চাপিয়ে দিয়ে সামরিক ছত্রছায়ায় পরিচালিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমস্ত অপকর্মকে হালাল করা হয়। খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতা ছাড়তে চাইছিলেন না, তখন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমেই শেখ হাসিনা তাকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে বাধ্য করেছিলেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছিলো। সে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব ছিলো ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে নিজেরা সরে যাওয়া। শেখ হাসিনা তাদেরকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পক না। শেখ হাসিনা সামরিক বাহিনীর প্রভাবে সরকার পরিচালনা করার প্রবর্তক না। শেখ হাসিনা সকল রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড বন্ধ রেখে ডঃ ইউনূসকে ক্ষমতায় বসানোর ষড়যন্ত্রকারী না। শেখ হাসিনা নিজেকে “মাইনাস” করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলন করেন নি। সুতরাং এই প্রোপাগান্ডাটি যে কতোটা ভিত্তিহীন সেটা একটু চিন্তা করলেই বুঝা যায়।

মজার ব্যাপার হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে সেসময় মতিউর রহমান, মাহফুজ আনামরা বলেছিলেন, “এই সরকার আমরা এনেছি। আমাদের কথা আপনাদের শুনতে হবে!”

মতি মাহফুজ গং ও নির্ভীক সাংবাদিকতা

এটা নিতান্তই পরিহাসের বিষয় যে, একদিকে মাহফুজ আনাম বলছেন, “ডেইলি স্টার ২৫ বছর ধরে ভীতি এবং পক্ষপাতিত্ব ছাড়া সাংবাদিকতা করে আসছে।” (প্রথম আলো, ০৬ ফেব্রুআরি ২০১৬), আবার অন্যদিকে তার পক্ষে লেখা ডজনের পর ডজন কলমাধারী লিখে চলেছেন যে, ডিজিএফআইয়ের চাপে বাধ্য হয়েই ডেইলি স্টার সেই ধারাবাহিক প্রোপাগান্ডা ছাপিয়েছে। আরো মজার ব্যাপার হলো, ২৫ বছর পূর্তিতে তাদের শ্লোগান,“25 years of Journalism without Fear and Favour.“ ডেইলি স্টার যদি ডিজিএফআইয়ের চাপে বাধ্য হয়ে ধারাবাহিক প্রোপাগান্ডা প্রকাশ করে, তাহলে তাদের এই “নির্ভীক” সাংবাদিকতার দাবি পুরোপুরি পরিহাসের বিষয় হয়ে যায়।

প্রথম আলো বা ডেইলি স্টার আসলে কোনো চাপে বা বাধ্য হয়ে মাইনাস টু প্রোপাগান্ডা চালায় নি; বরং তারা নিজেরাও সেই প্রোপাগান্ডার একটি অংশমাত্র। মাইনাস টুর ফলে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর মধ্যে যেমন কিছু সামরিক অফিসার ছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টারা ছিলেন, জামায়াতে ইসলামী ছিলো, তেমনিভাবেই ছিলেন ডঃ ইউনুস, মতিউর রহমান, মাহফুজ আনামরা। একটু কান পাতলেই আপনারা শুনতে পাবেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে মিডিয়ার স্বাধীনতা নেই বলে মাহফুজ আনামরা সবসময় বলে আসছেন। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সেই কথাটি তারা কখনোই মুখ ফুটে বলেন নি। প্রশ্ন উঠতে পারে, হয়তো অবস্থা এতোই খারাপ ছিলো যে, সেটা বলারও সাহস পান নি। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার চলে গেছে আজ ৭ বছরের উপরে হলো। প্রথম আলো বা ডেইলি স্টার কখনো কী বলেছে, সেসময় তাদের মুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছিলো? বলে নি। তখন বাধ্য হয়ে কোন কোন ভুল সংবাদ তারা ছাপিয়েছিলো, তার কোনো তালিকা কী প্রকাশিত হয়েছে? হয় নি।এর একমাত্র কারণ, তারা নিজেরাও সেই সিস্টেমের অংশ ছিলো। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সেই মাইনাস টু প্রোপাগান্ডার প্রত্যক্ষ বেনিফিশিয়ারী ছিলো।

প্রথম আলো, ডেইলি স্টার কি জনপ্রতিনিধি?
আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো, ডেইলি স্টার বা প্রথম আলো তাদের যে কোনো অপকর্মকেই হালাল করতে সেটাকে “জনগণের চাওয়া” বলে চালিয়ে দেয়। তারা নিজেদেরকে সরকারের বিরুদ্ধে “ওয়াচডগ” হিসেবে দাবি করে। এটি অনেকটা “গাঁয়ে মানে না, আপনি মোড়ল” জাতীয় মাতব্বরি; পিঠা ভাগ করা বাঁদরের ছল-চাতুরি। একটি গণতান্ত্রীক শাসন ব্যবস্থায় জনগণের অবস্থান সরকারের “বিরুদ্ধে” নয়; সরকার জনগণেরই প্রতিনিধি। সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত জনবিরোধী হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সেটির জন্য ওয়াচডগ হিসেবে জনগণই বিরোধী দলকে সংসদে পাঠিয়েছে। মিডিয়া কখনোই বিরোধী দলের বিকল্প নয়। মিডিয়ার দায়িত্ব সরকারের “বিরোধিতা” নয়; বরং সত্যকে সততার সাথে উপস্থাপন করা।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় মিডিয়া সংবাদ প্রতিষ্ঠানমাত্র; তারা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত নয়, জনগণের ব্যবসায়িক স্বার্থসংশ্লিষ্টও নয়। আমার জানামতে ভোটাভুটি দূরে থাক, বাংলাদেশে এমনকি কোনো জরিপও হয় নি, যার মাধ্যমে জনগণ প্রথম আলো বা ডেইলি স্টারকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারের বিরোধিতা করার জন্য মনোনীত করেছে। কোনো মিডিয়া সরাসরি জনগণের কাছে জবাবদিহিতাও করে না। তারা তাদের ইচ্ছামতোই সাংবাদিক নিয়োগ দেয়, মডারেশনের মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ করে। সেখানে জনগণের বিন্দুমাত্র অংশীদারিত্ব নেই। তাহলে জনগণের কাঁধে বন্দুক রেখে গুলি চালানোর এই অপচেষ্টা কেন?

মিডিয়ার স্বাধীনতা আসলে কি?
মাহফুজ আনাম প্রসঙ্গে “মিডিয়ার স্বাধীনতা” বিষয়টি অনেকবারই আলোচনায় এসেছে। মাহফুজ আনাম পক্ষের দাবি, বাংলাদেশে বর্তমানে মিডিয়ার কোনো স্বাধীনতাই নেই। মজার ব্যাপার হলো, এই বিষয়ে তারা শ’য়ে শ’য়ে কলাম প্রকাশ করে যাচ্ছেন কোনোরকম বাধাবিঘ্ন ছাড়াই! আওয়ামী লীগের শাসনামলে সরকারের হস্তক্ষেপে কোনো “সত্য” প্রকাশ করতে পত্রিকাগুলো ব্যর্থ হয়েছে, এরকম কোনো নজীর অন্তত আমার জানা নেই। সরকারের দ্বারা কোনো সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে নি। কোনো কার্টুনিস্ট আরিফ বা সুমন্ত আসলামকে সরকারের চাপে চাকুরি হারাতে হয় নি, কোনো তাসনীম খলিলকে অকথ্য নির্যাতনের স্বীকার হতে হয় নি।

আমার দেশের হলুদ সাংবাদিক মাহমুদুর রহমানকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে তার পত্রিকায় সুস্পষ্টভাবে “মিথ্যা” গুজব ছড়িয়ে বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টার কারণে। অবাক ব্যাপার হলো, কিছু ব্যতিক্রমবাদে আমাদের বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকবৃন্দ সেই মাহমুদুর রহমানের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছেন। স্পষ্টতই এদের কাছে মিডিয়ার স্বাধীনতা হলো, ইচ্ছেমতো মিথ্যা বলার স্বাধীনতা, প্রোপাগান্ডার স্বাধীনতা, টাকা খেয়ে যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে জনমত তৈরির স্বাধীনতা।

এরকম মিডিয়া কখনোই জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে না। এক্ষেত্রে সরকারও তার কর্তব্য পালন করতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। জনস্বার্থে সরকারের উচিত ছিলো মিডিয়া যাতে সত্য প্রচার করে, সেটি নিশ্চিত করা। এ উপলক্ষ্যে চমৎকার একটি সম্প্রচার নীতিমালাও করা হয়েছিলো। তার ভিত্তিতে আইন তৈরি কথা ছিলো। কিন্তু সেটি আর আলোর মুখ দেখে নি। যদিও সেটি শুধুমাত্র টেলিভিশনের জন্য প্রযোজ্য ছিলো, তবুও মিডিয়াকে জনবান্ধব করার ক্ষেত্রে চমৎকার ভূমিকা রাখতে পারতো। সরকার এক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে নি।

এ বিষয়টি নিয়ে সরকারকে অনতিবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। মিডিয়ার জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা ও আইন থাকা প্রয়োজন, যাতে তারা একদিকে যেমন মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালিয়ে জনস্বার্থবিঘ্নিত করতে না পারে, অন্যদিকে সত্য সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও যেন সরকার, কোনো রাজনৈতিক দল, বা মিডিয়া মাফিয়া থেকে কোনোরকম বাধার সম্মুখীন না হতে হয়।

সাংবাদিকের দায়বদ্ধতা ও আমাদের সাংবাদিকমণ্ডলী
অভিজ্ঞতা আমাকে অবাক হতে দেয় নি, তবে আমাদের সংবাদমাধ্যমের কেউই সত্যটাকে নির্ভীকতার সাথে বলতে না পারায় কিছুটা কষ্ট পেয়েছি মাত্র। মাহফুজ আনামের কাজটি যে একটি অপরাধ এবং সে অপরাধের বিচার হওয়া উচিত, সে কথাটি জোর করে কেউ বলতে পারেন নি। যারা মাহফুজ আনামের পক্ষ নিয়ে ধনুকভাঙ্গা পণ করে নেমেছেন, তাদের কথা বাদই দিলাম। যারা মাহফুজ আনামের কাজটিকে খারাপ হিসেবে স্বীকার করেছেন, তারাও বিচারের কথাটি উচ্চারণ করেন নি। উদাহরণস্বরুপ, বিডিনিউজ২৪ সম্পাদক ডেইলি স্টারের অপকর্মের অনেকগুলো উদাহরণ তুলে ধরলেও মাহফুজ আনামের সঙ্গ ছাড়তে পারেন নি। ঠোঁটকাটা ব্লগার, কলামিস্ট মাসুদা ভাট্টির মতো মানুষও মাহফুজ আনামের বিচার দাবি করতে পারেন নি। যদিও তার কাজটিকে তিনি অপরাধই বলেছেন। তাসনিম খলিলসহ অন্য যাদের লেখা পড়লাম, কেউই বলেন নি মাহফুজ আনামকে আইনের আওতায় আনা হোক। তিনি দোষী, নাকি নির্দোষ, সেটি আইনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হোক।

জানি না, আজ আপনারা কোনো ভীতি, নাকি স্বার্থের জন্য মাহফুজ আনামের বিপক্ষে যেতে ইতস্তত করছেন। তবে স্বার্থে আঘাত পড়লে এই মিডিয়া মাফিয়ারা আপনাদেরকে আস্তাকূঁড়ে নিক্ষেপ করতে দুইবার ভাববে না। আপনারা যদি সত্যিই মিডিয়ার স্বাধীনতা চান, তাহলে সত্যের পক্ষে কথা বলুন। মাহফুজ আনামের অপরাধকে অপরাধ হিসেবে দেখুন। তাকে আইনের আওতায় আনার জন্য সোচ্চার হউন।

বাংলাদেশের সৌভাগ্য, আপনাদেরও সৌভাগ্য যে, এখনো শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান হিসেবে আছেন। এখনো আপনাদের সত্য, সৎ ও সাহসী অবস্থানকে শ্রদ্ধা করা হবে। আপনাদের চুপ করে থাকার সুযোগে আজ মিডিয়া মাফিয়ারা জয়ী হলে সাংবাদিক হিসেবে ভবিষ্যতে আপনাদের আত্মা বিক্রয় করা ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।

profilepic

"চোর" ও "অছ্যুৎ বলাই" নিকের প্রায়-সাবেক ব্লগার। ঠোঁটকাটা লোক।


প্রতিক্রিয়া হতে “অপরাধীর ভুল-স্বীকার ও সুশীল প্রোপাগান্ডা মেশিন”

  1. Totokaka

    হে হে অনেকেই মনে করেন দেশের জনগন সত্য সত্যই কাঁঠালপাতাভুক। মাহফুজ সাহেব স্বিকার করেছেন গোয়েন্দা সংস্থার কথা ক্রসচেক না করে ছাফিয়েছেন, এখানে দুইটা জিনিষ লক্ষনীয়, ১. উনি বলেননাই ষড়যন্ত্র করার জন্য তিনি সংবাদ প্রকাশ করেছেন। ২. তিনি গোয়েন্দা সংস্থার চাপে সংবাদ ছাপিয়েছেন কিন্তু এখন কি উনি হাসুদির বিনা চাপে এসব কথা বলতে টেলিভিষন ট্রায়ালে হাজিরা দিচ্ছেন? একজনের নামে একটা অভিযোগ আসলে পৃথিবীর সভ্য দেশে সেটার সমাধান হয় একটা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ‌্যমে, আমাদের হাসুদি ওনার কামলাদের দিয়ে নিজের গায়ে নিরপরাধের সিল আগেই মেরে রেখেছেন, ইজ্জত তাতে এক বিন্দুও উদ্ধার হয়নি তাই এখন মাহফুজ সাহেবরে নিয়া নাটক শুরু করেছেন। হাসুদির আশেকে ময়দানেরা যখন মাইনাস টু নিয়া নাককান্না করে তখন কাঠালপাতাভূকরা ও অট্ট হাসে। কারা যেন বিমান বন্দরে ষড়যন্ত্রের দায় স্বীকার করেছিল, কারা যেন সারাদেশের গুন্ডা ঢাকায় এনেছিল মারামারি করার জন্য। আবারও হে হে।

    জবাব

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।