বাংলাদেশ ব্যাংক এখন একটি ক্রাইম সিন!

|

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান আজ পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। ছবি ফ্লিকার থেকে আই এম এফ এর সৌজন্যে - সিসি বাই-এনসি-এনডি ২.০

বর্তমানে যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশী আলোচনা হচ্ছে তা হচ্ছে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনা।  বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিবৃতি অনুযায়ী গত মাসের ৫ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের থেকে পাঠানো ৩৫টি ভুয়া পরিশোধ নির্দেশের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক নিউইয়র্ক থেকে ৯৫ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৭ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা স্থানান্তরের প্রস্তাব পাঠানো হয়। তার মধ্যে ৩০টি নির্দেশ আটকানো সম্ভব হয়। তবে পাঁচটি পরিশোধ নির্দেশের বিপরীতে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার বা প্রায় ৮০৮ কোটি টাকা ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায় চলে যায়। যার মধ্যে শ্রীলঙ্কা থেকে ২ কোটি ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে কারণ পরিশোধ নির্দেশে প্রাপকের নামের (একটি ভুয়া এঞ্জিও) বানান ভুল থাকায় মধ্যবর্তী একটি ব্যাংক অর্থ স্থানান্তর আটকে দেয়। ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার বা প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার মধ্যে ৬৮ হাজার ডলারের হদিস পাওয়া গেছে। এ টাকা উদ্ধার করা যাবে। তবে বাকী টাকা যদিও উদ্ধার করা যায় – অনেক সময় লাগবে।

অর্থ লোপাট হওয়ায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও অর্থ মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাছে এখনও আইনি সহযোগিতা চায়নি। ইতিমধ্যে প্রযুক্তি বিষয়ক বিভিন্ন রকমের ব্যাখ্যা হাজির হয়েছে, প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের নিরাপত্তা প্রক্রিয়াকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আইটি কনসালটেন্ট ও বিশ্বব্যাংকের তথ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি বিভাগের সাবেক পরিচালক রাকেশ আস্তানার পরামর্শে অর্থ লোপাটের তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অবস্থিত ফায়ারআই নামক সংস্থাকে নিয়োগ দেয়া হয়। ওয়ার্ল্ড ইনফরমেটিক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাকেশ আস্তানাই ফায়ারআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা। প্রতিষ্ঠানটি সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে। হ্যাকিং প্রতিরোধ, হ্যাকিং এলার্ট, হ্যাকিংয়ের পরে হ্যাকারদের তথ্য সংগ্রহ, হ্যাকিংয়ের প্রক্রিয়া ও ব্যবহৃত তথ্য উদ্ধারে পারদর্শী এই প্রতিষ্ঠান। এর মাঝে বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটারে নতুন ধরণের সফটওয়্যার লাগানোর কথা শোনা গেছে।

আপাতদৃষ্টিতে এই কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দেবার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ড. এম আসলাম আলম বলেন, অর্থ চুরির ঘটনাটি ঘটেছে ৫ ফেব্রুয়ারি। এরপর ২৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের বোর্ড সভা হয়েছে। ২৯ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের অডিট কমিটির সভা হয়েছে। কোনও সভাতেই বিষয়টি তাকে জানানো হয়নি। এই তিন বৈঠকের কোনওটিতেই বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনও আলোচনা হয়নি। স্বয়ং অর্থমন্ত্রী বলেছেন, “বাংলাদেশ ব্যাংক যেভাবে পুরো বিষয়টি হ্যান্ডেল করেছে তাতে আমি খুবই অখুশী”। মন্ত্রীসভার বৈঠকের খবর অনুযায়ী ‘এ ঘটনাকে ধামাচাপা দেওয়ার যে চেষ্টা হয়েছে’, তাতেও গভর্নরের ওপর ‘চটেছেন’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এটি নিয়ে নানা বিতর্ক হচ্ছে। সোসাল মিডিয়াতে ভারতীয় পরামর্শক নিয়ে অনেকে বিরক্তি প্রকাশ করছেন, বিভিন্ন টকশোতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উস্কে দেয়া হচ্ছে – আর এমন ভাবে সবাই মন্ত্যব্য করছেন যেন সবাই বিশেষজ্ঞ।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বাইরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলেও প্রযুক্তিবিদেরা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকেই দোষ দিচ্ছেন। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে কর্মরত তথ্য-প্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা বাংলাদেশ ব্যাংক ঘুরে এসে বলেন রিজার্ভের সুইফট কোড পাঠানোর কম্পিউটারটি সাধারণ কম্পিউটারের সঙ্গেই ছিল। এই কম্পিউটারের আলাদা কোন নিরাপত্তা ছিল না বা নির্দিষ্ট করা ছিলনা।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও ব্লগার রাগিব হাসানের মতে সাইবার নিরাপত্তা কোনো কারিগরি সমস্যা না, বরং এটা একটা মানবীয় সমস্যা। যে কোনো সিস্টেম হ্যাক করার সবচেয়ে সহজ এবং বহুল প্রচলিত পদ্ধতি হচ্ছে কারিগরি দিকে হাত না দিয়ে সিস্টেমের ব্যবহারকারীদের বোকা বানানো। নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের কাছে সঠিক ইউজার নেইম ও পাসওয়ার্ড বা অন্যান্য অথেন্টিকেশন ক্রেডেনশিয়াল দেয়া হয়েছে চোরদের পক্ষ থেকে। সমস্যাটা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের দিকেই। হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটারে ম্যালওয়ার বসিয়ে সেখানকার তথ্য চুরি করা হয়েছে, কীস্ট্রোক রেকর্ডার বসিয়ে সব কী-স্ট্রোক মানে কীবোর্ডে যা যা টাইপ হচ্ছে সব চুরি করা হয়েছে, তার পর সেখান থেকেই পাসওয়ার্ড বা অন্যান্য গুপ্ততথ্য চুরি গেছে। এই ম্যালওয়ার বসানোটা সম্ভব হতে পারে গাফিলতির কারণে।

তবে যারা উন্নত দেশগুলোতে অনলাইনে অর্থ স্থানান্তর করেন তারা জানেন যে অথেন্টিকেশন প্রক্রিয়া থাকে দুই বা তিন স্তর বিশিষ্ট। বিদেশে টাকা পাঠানোর নির্দেশ ব্যাংকে সঠিক পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে দিলে মোবাইল ফোনে মেসেজ আসে “আপনি কি এই নির্দেশ দিয়েছেন?” রিজার্ভ ব্যাংকের অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে এইরকম বহুস্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা ছিল কিনা এবং তা কিভাবে ভাঙ্গা সম্ভব হয়েছে – এটা তদন্তের বিষয়।  যে দেশে শুক্রবার ছুটি সেদিন এতগুলো ট্রান্সফার এডভাইস আসলো, তাতে ফেডারেল রিজার্ভ-এর খটকা লাগলো না কেন বা তারা জিজ্ঞেস করলো না কেন সেটাও বিবেচনায় আনতে হবে।

সেক্ষেত্রে আরেকটি সম্ভাবনাটা আছে যে ভেতরের কেউ জড়িত। এটি যেহেতু তদন্তাধীন ব্যপার, তাই এই ব্যাপারে মন্তব্য করব না। কিন্তু যেকোনো সিস্টেমের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা হলো তার ইউজারেরা, সেসব সিস্টেম যারা চালান, তাঁরা। যন্ত্রকে হুমকি দিয়ে বা ঘুষ দিয়ে কিছু করানো যায় না, কিন্তু মানুষকে যায়।

যে কোনো তদন্তের ক্ষেত্রে যে প্রশ্নগুলো সাধারণত প্রথমেই ওঠে তা হল — কে কখন কী জানতো। চুরির ঘটনার এতদিন এগুলোর কোনো উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না; এমনকি সেই প্রশ্ন তুলবে যে তদন্ত কমিটি তাই তৈরি করা যায় নি।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী অর্থ চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ওই দুজন হলেন, ডিলিং রুম শাখায় দু’জন যুগ্ম পরিচালক (জেডি) জোবায়ের বিন হুদা ও মিজানুর রহমান। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থার হেফাজতে নেওয়া হতে পারে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি, দিবাগত রাত প্রায় সাড়ে ১২টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফটের বার্তা বা সংকেত ব্যবহার করে ৩৫টি অর্থ স্থানান্তরের পরামর্শ বা অ্যাডভাইস পাঠানো হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে। পরের দিন ৫ ফেব্রুয়ারি শুক্রবারও বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালনের জন্য এসেছিলেন ৮ কর্মকর্তা। কিন্তু ওই দিন তারা কম্পিউটার খুলতে পারেননি। কম্পিউটারের সঙ্গে সংযুক্ত প্রিন্টারগুলোও অকেজো দেখতে পান। অথচ, ওই ৮ কর্মকর্তার কেউই ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে বিষয়টি জানাননি।  এ কারণে ছুটির দিনেও দায়িত্বে থাকা ওই ৮ কর্মকর্তাকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

পুরো ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ভয়াবহ গাফিলতি স্পষ্ট। আরও স্পষ্ট যে একটি বিশেষ মহল এটিকে ধামাচাপা দিতে তৎপর ছিল।  রিজার্ভের টাকা খোয়ানোর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরের চাকরি থেকে পদত্যাগের দাবি এসেছে চারিদিক থেকে। অবশ্য তাতে হারানো টাকা ফেরত পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

হ্যাকারারা বাংলাদেশ ব্যাংকের কারো সহায়তাসহ বা ছাড়া যেভাবেই চুরিটি করে থাকুক, বুঝতে হবে তারা ব্যাংকের পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেয়েছে – কাজেই বাকি টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন জরুরি। ফিলিপিন্সের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল (এএমএলসি) এ ঘটনায় ছয়জনকে শনাক্ত করেছেন এবং একজনের ছবি স্থানীয় পত্রিকায় এসেছে। সন্দেহভাজন যে ছয়জনকে শনাক্ত করা হয়েছে রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনে (আরসিবিসি) এদের মধ্যে পাঁচজনেরই অ্যাকাউন্ট রয়েছে। ওই পাঁচ অ্যাকাউন্টেই যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক থেকে ৮১ মিলিয়ন ডলার এনেছিলেন হ্যাকাররা। কিন্তু বাংলাদেশের তদন্তে এতো অগ্রগতি হয়েছে কি?

আজকে দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন।  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই পদত্যাগকে নৈতিক মনোবল ও সৎ সাহসের বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আতিউর রহমান যখন দায়িত্ব নেন তখন দেশের রিজার্ভ ছিল ছয় বিলিয়ন। আর এখন সেই রিজার্ভ ২৮ বিলিয়নের ওপর।  আতিউর রহমান জানিয়েছেন চুরি হওয়া অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা করা করতে গিয়ে কিছুটা দেরি হয়েছে। পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রণে, অর্থ ফেরত আনার সুযোগ দেখা দিয়েছে, তখন সবাইকে জানানো হয়েছে। তবে এই পদত্যাগ দেখিয়ে তদন্ত কাজে ভাটা যাতে না পড়ে। এটা একজনের দায়িত্ব ছিলনা।

যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাই এই অপরাধের সাথে জড়িত থাকেন, সেক্ষেত্রে তারা নিজেদের উদ্যোগে এই অপরাধের সাথে যুক্ত হন নি, এ অপরাধের পেছনে রাষ্ট্রের অন্যান্য উচ্চ ক্ষমতাধর মানুষদের প্ররোচনা এবং প্রশ্রয় ছিলো। সরকারকে বিপাকে ফেলার একটা চক্রান্তও হতে পারে একটা।

বাংলাদেশ ব্যাংক এখন একটি ক্রাইম সিন। আশা করব তারা স্থানীয় পুলিশ ও গোয়েন্দাদের সহযোগিতা নেবেন এ রহস্য উদঘাটন করতে এবং রাষ্ট্র নিজের স্বার্থে এর পেছনের লোকজনের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।

profilepic

ব্লগার, ফটোগ্রাফার, গ্লোবাল ভয়েসেস এর আঞ্চলিক সম্পাদক (দক্ষিণ এশিয়া)।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।